শুঁয়োপোকা থেকে কীভাবে প্রজাপতির জন্ম হয়?

শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতি

ছোটবেলায় আমি শুয়োপোকা দেখে ভয় পেতাম। বিশেষ করে সজনে গাছের শুয়োপোকাকে। অসংখ্য বিষাক্ত শুঙ্গ আছে এদের গায়ে। মানুষের চামড়ায় লাগলে চুলকানির একশেষ। ভয় পাওয়া তাই স্বাভাবিক। অথচ প্রজাপতিকে ভালোবাসি খুব। আমি কেন, প্রায় সব মানুষকেই মোহিত করে প্রজাপতির রঙিন ডানা। কিন্তু গায়ের চাষারা যদি জানত ঝিলমিল ডানার এই অদ্ভুদ সুন্দর প্রাণীগুলোই তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু–নির্ঘাত তারা প্রজাপতি নিধনে কোমর বেঁধে লেগে পড়ত। অবশ্য কোমর তারা বাঁধে, প্রজাপতির জীবনচক্রের প্রাথমিক পর্বে। বাজারে হাজারো কীটনাশকে ছয়লাব। এসব কীটনাশক নিয়ে চাষারা রীতিমতো কামান দাগার মতো করে ঝাঁপিয়ে পড়ে যুদ্ধে। মহাযুদ্ধ। আগে কৃষকদের বড় শত্রু ছিল প্রকৃতিক দুর্যোগ, খরা, বন্যা। এখন প্রজাপতির ছানারা। এ যুদ্ধে পরিপূর্ণ জয়লাভের সূত্র আবিষ্কার আজও সম্ভব হয়নি। কৃষক কীটনাশক ছিটায়, হাত বেছে পোকা মারে, কিন্তু তাতে কীটের সংখ্যায় কেবল কমে। পুরোপুরি ধ্বংস করা যায় না। মশাকে ধ্বংস করার নানা প্রযুক্তি আবিষ্কার হয়েছে। কিন্তু মশা হার মানে নি। প্রতিবছর নতুন নতুন কীটনাশক আবিষ্কার হচ্ছে। কিন্তু প্রজাপতি হার মানে না।

প্রজাপতির জীবনচক্রের চারটি পর্যায় দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। কিন্তু তাতে সাধ মেটেনি। মুগডালের ক্ষেত প্রজাপতিদের খুব পছন্দ। মুগ ক্ষেতে নানা প্রজাতির শুয়োপোকা দেখা যায়। কোনটা কোন প্রজাপতির ছানা শুয়োপোকা দেখে বোঝা মুশকিল। বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলতে পারেন। এই মুগ ক্ষেতেই ভালো মতোন প্রজাপতির ডিম এবং শুককীট (শুয়োপোকা) দেখেছি। আশ মেটেনি তাতে। কারণ প্রজাপতির তৃতীয় পর্যায়টাকে কখনও দেখিনি মুগ ক্ষেতে। অত ঘন লতাপাতার আড়ালে কোথায় যে ঘাপটি মেরে প্রজাপতির মূকখীট পড়ে থাকে! সজনে গাছের প্রজাপতির তিনটি পর্যায় দেখেছি। ডিম, শুয়োপোকা আর মুককীট। কিন্তু মুককীট থেকে কোন প্রজাপতিটা বেরোয় তা কোনদিন খেয়াল করিনি।

ছোটবেলায় বাড়ির এক কোণে একটা ঈষের মূল গাছ লাগিয়েছিলাম। সাপ তাড়ানোর জন্য। গাছটা ফুলে, ফেঁপে লতিয়ে আমাদের গোয়ালঘরের চালের অনেকখানি জায়গা দখল করে নেয়। কিছদিন পর দেখি, খুব সুন্দর এক জাতের প্রজাপতি ওই লতার পাতায় পাতায় উড়ছে। কবে যে ওরা ডিম পেড়েছে বলতে পারব না। কিছুদিন পর দেখি বেশ মোটা মোটা শুয়োপোকায় ছেয়ে গেছে ইষের মূল গাছের প্রতিটা লতাপাতা। তবে এরা যে প্রজাপতির ছানা, জানতাম না। খুব রাগ হলো পোকাদের ওপর। ব্যাটারা আমার সাধের গাছটা খেয়ে শেষ করে ফেলছে। আব্বাকে বললাম ওষুধ দিতে। আব্বা আমার কথায় কান দিলেন না। এক সপ্তাহের মধ্যে পুরো গাছটা সবাড় করে ফেলল ব্যাটারা! পাতা বলতে আর কিছুই নেই তাতে। শুধু সবুজ লতা গুলো করুণভাবে শুয়ে আছে গোয়ালের চালে।
বর্ষা তখন কেবল শুরু হয়েছে। একদিন মুষল ধারে ঝুম বৃষ্টি হয়ে গেল।

বিকেলে চালের দিকে তাকিয়ে মনটা খুশিতে ভরে গেল। সব ব্যাটা পোকা মরে পড়ে আছে। অবশ্য গাছের ডালেই লেপ্টে আছে মৃতদেহগুলো। শুকনো পাতার মতো হয়েছে দেখতে। ভাবলাম উচিত শিক্ষা হয়েছে ব্যাটাদের। দিন পনেরো পরেই দেখি অন্য ব্যাপার, শুকনো পাতার মতো সেই মৃতদেহ ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো ভারী সুন্দর একটা রঙিন প্রজাপতি। অবাক ব্যাপার তো, মরা পোকা থেকে প্রজাপতি! সেদিনই কিছুটা বোঝা-না বোঝার ধোঁয়শায় নিমজ্জিত হলাম।

এরপর একদিন কোনও এক বইয়ে পড়লাম প্রজাপতির জীবনচক্রের কথা। ঈষের মূল গাছের ওই পোকাগুলোর প্রজাপতি হয়ে যাওয়ার রহস্যটাও তখন সমাধান হয়ে গেল। জানলাম, প্রজাপতি গাছের পাতায় স্তূপকারে ডিম পাড়ে। এক সপ্তাহ পর সেই ডিম ফুটে বেরিয়ে আসে শুয়োপোকা বা শুককীট। শুককীট খুব দ্রুত বাড়ে। এসময় এদের প্রচুর খাদ্যের দরকার হয়।

শুয়োপোকা আকারে শুককীট দু সপ্তাহ কাটায়। এরপর এরা ঘুমিয়ে পড়ে। একে বলে স্প্তুাবস্থা বা শুককীট। সুপ্তাবস্থায় শুয়োপোকার ত্বক শুকনো শুকনো পাতার মতো দেখায়। মনে হয় মৃত কোনও পোকার খোসা। এসময় শুককীটের কোনও খাবার দরকার হয় না। এভাবে ২ সপ্তাহ ঘুমিয়ে কাটানোর পর জীবন্ত প্রজাপতি শুককীটের খোলস ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে।

ওই ঘটনা ১৮-২০ বছর আগের। তখন আমার ছোট বোনটা জন্মায়নি। তাই সেই ঈষের মূল গাছের কথা ওর জানবার কথা নয়। ও একটা লাগিয়েছে। মেহেদি গাছে উঠেছে গাছটা। বছরে একবার করে শুয়োপোকার উপদ্রব হয় সেই গাছে। অর্থাৎ প্রজাপতির জীবনচক্রটা বাড়িতে বসেই দেখা যায়। কিন্তু আমি বাড়ি থাকি না। তাই দেখাও হয় না।

এবার ঈদের ছুটিতে গিয়ে দেখি শুকনো পাতার মতো মূককীটগুলো লেপ্টে আছে ঈষের মূল আর মেহেদি গাছের ডালে ডালে। কিছু প্রজাপতিকেও ঘুরতে দেখলাম। মূককীটগুলো ছবি নিয়ে রাখার এই সুযোগ। আগামী বছর যখন আবার শুয়োপোকা জন্মাবে তখন, ওগুলোর ছবি নেয়া যাবে। তো তুললাম কিছু মুককীটের ছবি। দেখতে ভারী ভালো লাগল। বিশেষ করে মাথার দিকে একটা সুতোর মতো তন্তু বেরিয়ে এমনভাবে গাছের ডালে লেপ্টে আছে, দেখলে মনে হয় কে যেন সুতো দিয়ে গাছের সাথে পোকাটাকে গেঁথে রেখেছে।

ভাবছিলাম একটা প্রজাপতির ছবি নেয়া যায় কীভাবে? প্রজাপতিরা বড় চঞ্চল। এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকছে না দু সেকেন্ডও। কমদামী এই ক্যামেরা দিয়ে চঞ্চল প্রজাপতির ছবি তোলা দুঃসাধ্য কাজ।

কিন্তু দুঃসাধ্য কাজকেই সহজ করে দিল এক তরুণ প্রজাপতি। ওপর থেকে টুপ করে পড়ল মাটিতে রাখা একটা গামলা ভেতর। স্থির হয়ে বসে থাকল ওটা। ছবি তোলার পর্যাপ্ত সুযোগ পেলাম। তুললামও। কিন্তু নড়ছে না কেন বুঝলাম না। সাথে ছিল আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট, খালাতো ভাই সাহেদ। ও বলল, শুকনো মূককীট থেকে বেরিয়েছে। তারমানে উড়তে শেখেনি এখনও ওটা। দারুণ সুযোগ। প্রজাপতিটার সব দিকের ছবি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে তোলা যাবে।

তরুণ প্রজাপতিটা আলতো করে ধরে হাতে বসালাম। ভালোমানুষের মতো বসে থাকল। আরেক হাত ক্যামেরায় ক্লিক ক্লিক। মিনিটখানেক পরেই প্রজাপতিটা প্রথম ওড়ার চেষ্টা করল।

কিছুটা উড়ে গিয়ে বসল বাঁশের খুঁটির ওপর। ওখানে কয়েটা শট নিলাম। তারপর আবার উড়তে গিয়ে পড়ল টিউবওয়েল পাড়ে। ভাগ্যিস কোনও মুরগি আশপাশে ছিল না। থাকলে নির্ঘাত ঠুকরে খেয়ে ফেলত। যাই হোক ওকে দ্রুত সেখান থেকে তুলে দিলাম।

উড়ে গিয়ে বসল মেহেদি গাছের পাতায়। অর্থাৎ প্রজাপতির জীবনচক্রের চারটি পর্যায়ের দুটি পর্যায়ের ছবি পেলাম। বাকি থাকে দুইটা। ডিমের ছবি এখন পাওয়া সম্ভব নয়। আগামী বছরের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এখন খুঁজেপেতে যদি একটা শূককীট অর্থাৎ শুয়োপোকার দেখা পাওয়া যায়?
পেলাম। দু দুটোর।

একটা শুককীট আর মূককীট তো পাশাপাশিই পেয়ে গেলাম। গাছের ওপরে। একটা টুলের ওপর দাঁড়িয়ে নিলাম একটা শট। চরম সৌভাগ্য না হলে এমটি হয় না।

কিছুক্ষণ পরে আমাদের চোখের সামানেই সদ্য খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসা প্রজাপতিটা উড়ে চলে চলে গেল। দুরে বহদূরে। চোখের আড়ালে।

%d bloggers like this: