কোলেস্টেরল কমানোর জন্য কোন কোন খাবার বাদ দিতে হবে?

অপকারী কোলেস্টেরলের হাত থেকে বাঁচার জন্য বিশেষজ্ঞরা যে সমস্ত খাবারগুলি এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়ে থাকেন তার মধ্যে থাকতেই পারে পছন্দের খাবার বা প্রিয় খাবার। কিন্তু তা হলে কী হবে? নিজের শরীর সুস্থ

রাখতে হলে অবশ্যই সেই নিষেধ মেনে চলা উচিত।

১। ফাস্টফুড –

সাধারণ ভাবে এই তালিকার প্রথমেই যে নামটা উঠে আসবে তা হল যে কোনো রকমের ভাজা জাতীয় খাবার। এই নাম জানার পর অনেকেরই কপালে ভাঁজ পড়বে। কিন্তু তবুও সেটি এড়িয়ে চলাই কাম্য। কারণ এই সমস্ত তেলে ভাজা তৈরির জন্য ব্যবহৃত তেল স্বাস্থ্যের পক্ষে খুবই ক্ষতিকর। তাতে থাকে অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট বা চর্বি। তা ছাড়াও উচ্চ তাপমাত্রায় তৈরি হয় এই খাবার। ফলে আগুনের তাপে এর মধ্যে থাকা ফ্যাটি অ্যাসিডের প্রকৃতি বদলে যায়। এই বদলের ফলে তৈরি হয় ক্ষতিকারক মৌল পদার্থ। এই মৌল পদার্থটি ধমনীর জন্য মোটেই ভালো নয়। তা ছাড়া এটি অত্যন্ত কার্সিনোজেনিক। এর মধ্যে তৈরি হয় ট্রান্স ফ্যাটও। এটিও খুবই ক্ষতিকারক। তাই এই জাতীয় ভাজাভুজি, জাঙ্ক ফুড ও ফাস্ট ফুড খাওয়া সর্বপ্রথম বাদ দিতে হবে।

২। কোল্ড ড্রিঙ্ক –

এর পরই আসা যেতে পারে বেশির ভাগ মানুষের দ্বিতীয় প্রিয় খাদ্য কোল্ড ড্রিঙ্ক বা সফট ড্রিঙ্কের কথায়। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই ধরনের যে কোনো নরম পানীয়ই শরীরের জন্য সাংঘাতিক ক্ষতিকর। এর থেকে থেকে হওয়া ক্ষতির মাত্রা কল্পনাতীত। মোটা হয়ে যাওয়া, পেটের সমস্যা হওয়া-সহ যাবতীয় অন্যান্য ক্ষতির সঙ্গে সঙ্গে অবশ্যই যুক্ত হয় কোলেস্টেরলের বিষয়টিও। এর থেকে শরীরে তৈরি হয় খারাপ কোলেস্টেরল। কারণ এই পানীয়র মধ্যে থাকে প্রচুর পরিমাণে অ্যাডেড সুগার। এই উপকরণটি শরীরে এলডিএল-এর মাত্রা বহুগুণ বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। এই অ্যডেড সুগার এইচডিএল এর মাত্রা কমিয়ে দেয়। ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এই সবগুলি শেষমেশ এলডিএল-এর পরিমাণে বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। তাই যতই প্রিয় হোক কোল্ড ড্রিঙ্ককে বাদ দিতে পারলেই হৃদয় সুরক্ষিত থাকবে।

৩। সোডা –

কোল্ড ড্রিঙ্ক যে কারণে ক্ষতিকর, ঠিক একই দোষে দোষী সোডা। সোডার মধ্যেও থাকে প্রচুর চিনি। এই চিনি শরীরের ট্রাইগ্লিসারাইড পরিমাণ বাড়ায়। এই ট্রাইগ্লিসারাইড শরীরের ওজন বাড়ায়। তার ফলে এলডিএল-এর মাত্রা বৃদ্ধি পায়।

৪। আইসক্রিম –

এই বারের নামটিতে অবশ্যই থাকবে আইসক্রিম। আইসক্রিম খেতে ভালোবাসেন না এমন মানুষের সংখ্যা হয়তো খুবই কম আছে। কিন্তু সেই বৃহৎ সংখ্যক মানুষের উদ্দেশেই একটি কথাই বলার, খারাপ কোলেস্টেরল বৃদ্ধিকারী খাবারের তালিকায় বিশেষজ্ঞরা আইসক্রিমকেও অন্তর্ভুক্ত করেছেন। কারণ এতেও রয়েছে প্রচুর পরিমাণ অ্যাডেড সুগার। যা এলডিএলকে বাড়িয়ে দিয়ে শরীরের অপূরণীয় ক্ষতি করে। তাই কালেভদ্রে এক আধটা ছাড়া আইসক্রিমকেও খাদ্য তালিকাচ্যূত করাই ভালো।

৫। কেক

বাদের তালিকার পরের নাম হল কেক। শীতকাল এলেই সকলের মন কেক কেক করে ওঠে। তা ছাড়া আজকাল বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে কেক কেটে তা খাইয়ে উদযাপন করার একটি বাড়তি চল হয়েছে। ফলে না চাইলেও বেশ কয়েকবার অতিরিক্ত কেক খাওয়া কম বেশি প্রায় সকলেরই হয়ে যায়। তা ছাড়া কেকপ্রিয় মানুষের সংখ্যাও নেহাতই কম নয়। ফলে শরীরে খারাপের উপাদানের মাত্রা একটু একটু করে অনেকটাই জমে যায় আমাদের অজানতেই। কারণ এতেও রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যডেড সুগার। এই অ্যাডেড সুগার ঠিক কী ক্ষতি করতে পারে তা তো জানাই। তাই এটিকেও মন ধরে বাদ দেওয়াই ভালো।

৬। প্যাস্ট্রি –

এর পর আসা যাক প্যাস্ট্রির কথায়। এটিও মনের মতো একটি খাবার। কিন্তু তা হলেও বলতে হবে এটি খাবারের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া ভালো। কারণ সেই একই কথা অ্যাডেড সুগার।

৭। কুকি –

খারাপ কোলেস্টেরল বাড়ার জন্য দায়ী খাবারের তালিকা থেকে বাদ যায়নি কুকি। এগুলি খেতে ভালো হলে কী হবে? এর ক্ষতিকর গুণও আছে। এটিও শরীরের জন্য ক্ষতিকারক কোলেস্টেরল এলডিএল বাড়ানোর জন্য দায়ী। এর কারণ হল এর মধ্যে থাকা অতিরিক্ত পরিমাণের অ্যাডেড সুগার।

৮। চকোলেট –

চকোলেটে বিভিন্ন ধরনের অ্যাডেড সুগার থাকে। থাকে ট্রান্স ফ্যাট। তাই চকোলেট লোভীদের সাবধান হওয়া উচিত। চকোলেটও কিন্তু মিষ্টি স্বাদের আড়ালে হার্টের ক্ষতির জন্য সাংঘাতিক ভাবে দায়ী।

৯। ফলের রস –

ফলের রস খেতে ভালোবাসেন না এমন মানুষের সংখ্যা প্রায় নেই বললেই চলে। শুধু তাই নয়। ফলের রস খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে খুবই উপকারী। তাই তা বাড়িতে তৈরি করে খাওয়া খুবই স্বাস্থ্য সম্মত ও উপকারীও। মানুষের এই প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখেই কাজকে অনেক সহজ করে দিতে আজকাল ফলের রস রেডিমেড বাজারে বিক্রি হয়। এগুলি টিনের ক্যানে বা কৌটোয় সংরক্ষিত অবস্থায় থাকে। সেগুলি কিন্তু মোটেই স্বাস্থ্য সম্মত ও উপকারী নয়। এতে তো প্রক্রিয়াজাত করণের জন্য অতিরিক্ত ও ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশ্রিত হয়ই, সঙ্গে যুক্ত হয় অ্যাডেড সুগারও, এর কোনোটিই স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। তাই বাদ দেওয়া উচিত প্রক্রিয়াজাত করা ফলের রস।

১০। বেকড ফুড –

এর পর যা বাদ পড়তে চলেছে তা হল, বেকড বা সেঁকা খাবারদাবার। যে কোনো খাবার যেগুলি বাজারের বিক্রি হয় সেগুলি যদি হয় বেকড, অর্থাৎ আগুনে সেঁকে তৈরি বা বানানো, তা হলে তা খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। কারণ তাতে অতিরিক্ত তাপের কারণে তৈরি হয় ট্রান্স ফ্যাট। এই ট্রান্স ফ্যাট এইচডিএল-এর পরিমাণ কমিয়ে দেয় এবং এলডিএল-এর পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। এলডিএল রক্তবাহী নালীর মধ্যে ডেলা ডেলা দানার সৃষ্টি করে। যা রক্ত সংবহনের পথে বাধার সৃষ্টি করে। এর ফলে হৃদরোগ হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়।

১১। প্যাকেট জাত খাবার –

এই ক্ষতিকর খাবারের তালিকায় রয়েছে প্যাক করা যে কোনো ধরনের খাবারও। তাই এই সমস্ত খাবারের প্যাকের গায়ে লেখাগুলি খুব ভালো করে পড়ে নেওয়া উচিত। সেখানেই এই ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ লেখা থাকে, সেগুলি দেখে নিয়েই তবেই প্যাক করা খাবার কেনা ও খাওয়া উচিত।

১২। সসেজ, হ্যামবার্গ –

এর পর আশা যাক প্রক্রিয়াজাত করা অন্যান্য খাবারের কথায়। বাজারে বহুল বিক্রিত বিশেষ করে প্রক্রিয়াজাত মাংসেও এই ক্ষতিকারক গুণগুলি রয়েছে। প্রক্রিয়াজাত মাংসের মধ্যে সসেজ বা হ্যামবার্গার শরীরের মধ্যে এলডিএল অর্থাৎ ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বৃদ্ধি করে। সসেজ বা হ্যামবার্গার খাওয়া বা কেনার আগে তার ওপরে থাকা লেবেলটি ভালো করে পড়ে দেখে তবেই কম স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা সংশ্লেষযুক্ত চর্বির খাবার কেনা উচিত।

১৩। লাল মাংস –

মাংস, বিশেষ করে লাল মাংস কোলেস্টেরল বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড়ো ভূমিকা নেয়। তাই পারত পক্ষে এটি এড়িয়ে চলা উচিত এই লাল মাংস বলতে বোঝায় – গরু, শূকর, পাঁঠা বা ভেড়ার মাংস। যদিও এর চর্বিযুক্ত অংশই অনেকের বেশি প্রিয়। তবুও বাড়িতে রান্না করে খেলেও এর চর্বিযুক্ত অংশ বাদ দিয়ে খাওয়াই ভালো। এতে স্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ খানিকটা কমানো যায়। তা না হলে হৃৎপিণ্ডের রোগের ক্ষেত্রে এটি আরও মারাত্মক হতে পারে। তাই মাংস খাওয়ার স্বাদ ও লোভ পূরণের ক্ষেত্রে মুরগির মাংস খাওয়া যেতে পারে। এতে সিদ্ধও করা সম্ভব বাড়িতে তৈরি হলে স্বাস্থ্য সম্মত ভাবে রোস্টও করে নেওয়া যেতে পারে। এতে পুষ্টিগুণ ও খাদ্যগুণ দুই বজায় থাকে। পাশাপাশি ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড যুক্ত বিভিন্ন মাছও খাবারের তালিকায় রাখা যেতে পারে।

১৪। পাউরুটি-

সকাল হলেই ব্রেকফাস্টের জন্য অনেকেই পাউরুটির ওপর ভরসা করে থাকেন। কিন্তু জানেন কী সাদা পাউরুটি ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বৃদ্ধির জন্য দায়ী। এর মধ্যে থাকা সুগার শরীরের ভেতরে প্রবেশ করে। তা প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। পরোক্ষ ভাবে তা খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ায়।

১৫। পাস্তা –

আজকাল পাস্তা অনেকেই খেয়ে থাকেন। কিন্তু এর মধ্যেকার উপাদানও সাদা পাউরুটির মতোই শরীরের ক্ষতি করে। যার ফল স্বরূপ এলডিএল-এর মাত্রা বৃদ্ধি পায়।

১৭। ভাত –

ভাতও কিন্তু কোলেস্টেরলের খারাপ প্রভাবের জন্য দায়ী। সাদা ভাতে থাকে প্রচুর শর্করা। এই শর্করা খারাপ কোলেস্টেরলের বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করে।

১৮। ডিম –

এই বার আশা যাক সেই বিতর্কিত নামে, ডিম। ডিম বললেই দুইটি অংশ মনে আসে, সাদা অংশ ও হলুদ অংশ। এই হলুদ অংশ অর্থাৎ ডিমের কুসুম খাওয়া এড়িয়ে চলা উচিত। তবে সাদা অংশটি স্বাচ্ছন্দ্যে খাওয়া যেতে পারে। যদি কোলেস্টেরল উচ্চমাত্রায় থেকে থাকে তবে ডিমের কুসুম না খাওয়া সব থেকে বুদ্ধিমানের কাজে। তবে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শক্রমে সপ্তাহে দুই বা তিন দিন মোট দুই থেকে তিনটি ডিমের কুসুম খাওয়া যেতে পারে। তবে অবশ্যই সঙ্গে ব্যায়ামও করতে হবে। সেই সময় হাতে না থাকলে কুসুম খাওয়া পুরোপুরি বর্জন করা উচিত। অবশ্যই রান্না করা ডিমের ঝোল বাদ দিতে হবে।

১৯। মাখন –

এর পরের নাম মাখন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন খাবারে মাখন টুকটাক ব্যবহার প্রতি ঘরেই হয়ে থাকে বলা যায়। কিন্তু মাখন খাওয়াও এড়িয়ে চলতে পারলে ভালো। কারণ এতে প্রচুর পরিমাণে সংশ্লেষিত দুধ জাতীয় চর্বি এবং কোলেস্টেরল থাকে। তাই সাধারণ মাখন বাদ দিয়ে বাদামের মাখন অর্থাৎ পিনাট বাটার বা মার্জারিন এই জাতীয় কিছু বিকল্প বেছে নেওয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো যে সব খাবারে মিল্ক ফ্যাট বা দুধ জাতীয় চর্বির পরিমাণ ১%-এর বেশি রয়েছে, সে সব খাবার না খাওয়াই ভালো।

২০। নারকেল –

এ আশা যাক ফলের কথায়। নারকেল। হ্যাঁ, এই বাদের তালিকায় আছে নারকেলও। একে এড়িয়ে চলাই ভালো। তবে শুধু কাঁচা বা ভাজা নারকেল নয়, নারকেল তেল যুক্ত কোনোও খাবার এড়িয়ে চলা ভালো। কারণ নারকেল এবং নারকেলের তেল এই দুই প্রকারেই প্রচুর পরিমাণে সংশ্লেষিত চর্বি রয়েছে।

২১। রিফাইন্ড গ্রেন –

এ ছাড়াও যেটি বর্জন করতে পারলে ভালো হয়, তা হল – যে কোনো রকমের রিফাইন্ড গ্রেন বা পরিশোধিত শস্য, ময়দা। কোলেস্টেরল থেকে বাঁচতে খাওয়া বন্ধ করতে হবে। পরিশোধিত শস্য বা ময়দা থেকে তৈরি খাবারে পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট থাকে। এই পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে । তাই জন্যই এর থেকে তৈরি সাদা পাউরুটি, পাস্তা খাওয়া বন্ধ করা উচিত। এর পরিবর্তে অন্যান্য শস্যজাত খাবার খাওয়া যেতে পারে। খাওয়া যেতে পারে পুরোপুরি আটার তৈরি রুটি।

%d bloggers like this: