সাবান বিভিন্ন কালার হয় কিন্তু ফেনা সাদা হয় কেন?

বাজার থেকে বেগুনী, নীল, সবুজ, লাল বা অন্য যে রঙেরই সাবান কিনে আনুন না কেন, একটু ভিজিয়ে হাত হাতে নিয়ে ঘষাঘষি করে দেখবেন ফেনা হয়েছে সাদা রঙের। কি আজব ব্যাপার! ম্যাজিক ম্যাজিক ভাবসাব লাগে, তাইনা?

তবে এর পেছনের ব্যাখ্যা জানলে বুঝতে পারবো আসলে ওসব ম্যাজিক ট্যাজিক কিছুই না। ব্যাপারটা সাবানের ফেনা তৈরির মতো সহজ।

প্রথম কথা হলো সাবানে রং কেন হয়? অবশ্যই বিভিন্ন ডাই (রঞ্জক পদার্থ) সাবান তৈরির সময় মিশিয়ে দেবার জন্যই সাবানের রঙ আসে। কিন্তু এর জন্য প্রচুর পরিমাণ রঞ্জক পদার্থ ব্যবহার করা নয় না, খুব সামান্য পরিমাণই যথেষ্ট সাবানে রঙ আনতে। অতিরিক্ত রঞ্জক ব্যবহার করা হলে সেটা আমাদের জামাকাপড়ের বারোটা বাজিয়ে ছাড়তো। আর অল্পতেই যদি কাজ হয় বেশি বেশি কেন দিবে!

হাত ধোবার সময় বা অন্যান্য কাজে যখন সাবান ব্যবহার করি তখন সামান্য পরিমাণ সাবানই আমরা ব্যবহার করি। এতে করে রঞ্জক পদার্থ ফেনার মধ্যে আসে অতি নগণ্য পরিমাণ। ফলে সাবানের ঐ রঙটি আর ফেনার মধ্যে প্রকাশিত হতে পারেনা।

মূলত এর জন্যই সাবানের রঙের সাথে ফেনার রঙের কোন মিল নেই। এখন প্রশ্ন উঠবে সাদাই কেন? অন্য রঙ কী দোষ করলো? এবার আমাদের পদার্থবিজ্ঞানের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

ফেনা কী? ফেনা হলো অসংখ্য ছোট ছোট বুদবুদের সমষ্টি। বুদবুদ চিনতে তো আর অসুবিধা হবার কথা নয়। দেখে ফেলি তারপরও।

কিন্তু একি!! প্রতিটা বুদবুদ রঙিন দেখায় কেন আবার? এরজন্য অবশ্য বুদবুদের গঠন প্রকৃতি জানা দরকার।

প্রতিটি বুদবুদের মধ্যে বাতাস আটকে থাকে, আর চারদিকের ঝিল্লীটি সাবান আর পানির অণুর সমন্বয়ে তৈরি হয় যেখানে সাবানের দুইটি স্তরের মধ্যখানে পানি আটকে থাকে। ঝিল্লীটি যথেষ্ট পাতলা, আলো শোষণ করার ক্ষমতাও নেই।

বুদবুদের দিকে খেয়াল করলে দেখতে পাবেন সেটা প্রায় স্বচ্ছ। পরিবেশের সাদা আলোর বেশিরভাগই বুদবুদের এপাশ-ওপাশ চলে যায়। তবে কিছু আলো বুদবুদের ঝিল্লীর দুই পৃষ্ঠ থেকে প্রতিফলিত হয়। বাইরের ও ভিতরের দুই পাশ পৃষ্ঠ থেকে প্রতিফলিত আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য মিলিত হয়ে নতুন তরঙ্গদৈর্ঘ্য তৈরি করে যার উপর ভিত্তি করে আমরা বিভিন্ন রঙ দেখতে পাই বুদবুদের পৃষ্ঠ হতে।

এখন আসি ফেনার প্রসঙ্গে।

সাবানের ফেনাকে একটু ছড়িয়ে ছিটিয়ে নিয়ে ছবি তুললে কিন্তু দারুণ ছবি পাওয়া যায়।

ছোটখাটো মোবাইলে তোলা সাবানের ফেনার ম্যাক্রো ছবি উপরেরটি। কষ্ট হলেও আশাকরি ছবিটি দেখে বোঝা যাচ্ছে এখানে অসংখ্য বুদবুদ রয়েছে। অর্থাৎ সাবানের ফেনা ছোট ছোট অগণিত বুদবুদ নিয়েই গঠিত।

তাহলে কথা হলো বুদবুদ দেখতে রঙিন মনে হলেও ফেনা কেন সাদা?

অনেকেই বলে থাকেন ঘটনাটির জন্য আলোর প্রতিফলন জড়িত। তবে ফেনাকে দাদা দেখাতে প্রতিফলনের থেকেও অনেক বেশি ভূমিকা রাখে আলোর বিক্ষেপণ। কোন ক্ষুদ্র কণার উপর আলো পড়ে সেটি চারদিকে ছড়িয়ে যাওয়াই হলো আলোর বিক্ষেপণ।

এখানেও আরেকটা প্রশ্ন চলে আসতে পারে। আলোর বিক্ষেপণের জন্যই তো আকাশ নীল দেখায়। সেখানে আমরা জেনেছিলাম বিক্ষেপণের সময় বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ভিত্তিতে আলো ছড়িয়ে যায়। তাহলে ফেনাতে আবার কী হলো? আসলে ওরকমটা হবার জন্য কণার আকার একটা নির্দিষ্ট মাপের মধ্যে ছোট হতে হয়।

কিন্তু সাবানের ফেনার মধ্যে থাকা বুদবুদগুলো ছোট হলেও বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে বিভক্ত করে দেয়ার মতো অতোটাও ছোট নয়। ফলে যখন সাদা আলো ফেনার মধ্যে থাকা বুদবুদের মধ্যে দিয়ে বিক্ষেপিত হয় তখন সেই সাদা আলো ভেঙ্গে না গিয়ে পুরোটাই বিক্ষেপিত হয় অর্থাৎ চারদিকে ছড়িয়ে যায়। এরপর চারদিকে ছড়িয়ে যাওয়া সেই সাদা আলো আমাদের চোখে প্রবেশ করে এবং আমরা ফেনাকে সাদা দেখি।

একই কারণে লাল আলোতে ফেনাকে লাল দেখতে পাবেন।

%d bloggers like this: